সকাল ৬:২৬,   শনিবার,   ২০শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ,   ৫ই শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ,   ১৩ই মহর্‌রম, ১৪৪৬ হিজরি

এগোচ্ছে অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজ, গেম চেঞ্জার জাপান

নিউজসুনামগঞ্জ ডেস্ক:

শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও রফতানি বাড়াতে সম্ভাবনাময় সকল এলাকায় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করে দেশের উন্নয়নের গতি বাড়াতে সরকার চালু করেছে অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজ।
এ লক্ষ্যে গড়ে তোলা হয়েছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ—বেজা।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০৩০ সাল নাগাদ দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। ইতোমধ্যে অনুমোদন পেয়েছে ৯৩টি অঞ্চল। বাস্তবায়নাধীন আছে ২৮টি।

প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে থাকা বেজার গভর্নিং বোর্ড এখন পর্যন্ত সরকারি ৫৪টি, বেসরকারি ২৩টি এবং চীন, জাপান ও ভারতের জন্য চারটি অর্থনৈতিক অঞ্চলের অনুমোদন দিয়েছে।

একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করবে বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা)।

বেজা আপাতত চট্টগ্রামের মিরসরাই ও ফেনীকে ঘিরে ৩০ হাজার একর জমিতে মহেশখালী অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পশহর গড়ে তোলার প্রতি বেশি জোর দিচ্ছে।

মৌলভীবাজারের শ্রীহট্ট ইকোনমিক জোন, বাগেরহাটের মোংলা ইকোনমিক জোন এবং চীন, জাপান ও ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলেও দ্রুত কাজ এগিয়ে চলছে।

এর মধ্যে শ্রীহট্টে বিনিয়োগকারীদের জমি বরাদ্দ শেষ। মহেশখালী, মোংলা ও মিরসরাইয়ে জমি বরাদ্দ চলছে। বেসরকারি ২৩টি অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর মধ্যে ৭টি চূড়ান্ত লাইসেন্স পেয়েছে।

বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, বঙ্গবন্ধু শিল্পশহর ও শ্রীহট্ট অঞ্চলের কারখানাগুলো অবিলম্বে উৎপাদনে যাবে। বেসরকারি ছয়টি অর্থনৈতিক অঞ্চলে ইতোমধ্যে উৎপাদন শুরু হয়েছে। জাপান ও চীনের অর্থনৈতিক অঞ্চলে স্থাপিত কারখানাও চালু হবে।

বেজা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের জন্য সহজে জমি মিলছে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির মাধ্যমে গ্যাস সমস্যারও সুরাহা হচ্ছে। শিল্পকারখানায় বিদ্যুৎও যাচ্ছে।

আগামী ডিসেম্বর নাগাদ বেজা ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু করবে। এতে বাংলাদেশের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ আরও বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বেজাকে চারটি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে— সরকারি পর্যায়, বেসরকারি পর্যায়, সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারী (পিপিপি) ও বিদেশি। বেসরকারি অঞ্চলগুলোর মধ্যে কয়েকটিতে উৎপাদন শুরু হয়েছে।

গেম চেঞ্জার জাপান

বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, শুধু জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চল হবে, এটা আগে চিন্তাও করা যায়নি। জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চলটাই দেশের জন্য ‘গেম চেঞ্জারের’ ভূমিকা পালন করবে।

বেজা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিশ্বের তৃতীয় শীর্ষ ইস্পাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান জাপানের নিপ্পন স্টিল অ্যান্ড সুমিতমো মেটাল বাংলাদেশের ইস্পাত খাতে বিনিয়োগ করছে।

গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর নিপ্পনের পরিচালক নমুরা ইউচি ঢাকায় এসে বেজা’র সঙ্গে ১০০ একর জমি ইজারা নেওয়ার চুক্তি করেছেন। যৌথ বিনিয়োগে নিপ্পনের ইস্পাত কারখানাটি হবে চট্টগ্রামের মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে।

বিশ্বের শীর্ষ মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান জাপানের হোন্ডা মোটর করপোরেশন বেসরকারি আবদুল মোনেম ইকোনমিক জোনে ২৫ একর জমিতে কারখানা করেছে। ইতোমধ্যে রাস্তায় নেমেছে দেশে উৎপাদিত হোন্ডা ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেলও।

এছাড়া ভারত, থাইল্যান্ড, চীন, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকেও প্রচুর বিনিয়োগ প্রস্তাব আসছে।

বেজা’র হিসাব অনুযায়ী, সরকারি তিনটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে ইতোমধ্যে প্রায় ১ হাজার ৬৩১ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকার সমান।

এসব বিনিয়োগের বেশিরভাগই বিদেশি। বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ে জমি ইজারাও নিয়েছে দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো।

বেসরকারি ছয়টি অর্থনৈতিক অঞ্চলেও বিদেশি বিনিয়োগ আসছে। এখানকার কারখানায় উৎপাদনও শুরু হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আবদুল মোনেম ইকোনমিক জোনে মাটি ভরাটের কাজ শেষ। সেখানে হোন্ডা করপোরেশন ২৫ একর জমি নেওয়ার চুক্তি করেছে। এই জমিতে হোন্ডা প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে কারখানা করবে।

আবদুল মোনেম কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের বলেন, তারা প্রায় ১৫টি কোম্পানির বিনিয়োগ প্রস্তাব পেয়েছেন। বেশিরভাগই জাপানি। এগুলোর পর্যালোচনা চলছে।

সম্প্রতি বেজা’র কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় চট্টগ্রামের মহেশখালী বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের নাম বদলে ‘সোনাদিয়া ইকো-ট্যুরিজম পার্ক’ নামকরণের অনুমোদন দিয়েছে। এছাড়া সিরাজগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চল, কিশোরগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চল, কর্ণফুলী ড্রাইডক বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, ইস্টওয়েস্ট বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলকে জোন ঘোষণা ও তাদের দেওয়া লাইসেন্সের ভূতাপেক্ষ অনুমোদন দিয়েছে বেজা।
বেজা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ২০২০ সালের ২০ আগস্ট অনুষ্ঠিত বোর্ডের সপ্তম সভায় আরও ১০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এগুলো হচ্ছে— মানিকগঞ্জের শিবালয়ে মানিকগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চল, টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে টাঙ্গাইল অর্থনৈতিক অঞ্চল, নওগাঁয় সাপাহার অর্থনৈতিক অঞ্চল, ঢাকার নবাবগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চল, দিনাজপুর অর্থনৈতিক অঞ্চল, সুনামগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চল, পাবনার বেড়ায় পাবনা অর্থনৈতিক অঞ্চল, বরিশালের হিজলায় চরমেঘা অর্থনৈতিক অঞ্চল, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে নোয়াখালী অর্থনৈতিক অঞ্চল ও চট্টগ্রামে সন্দীপ অর্থনৈতিক অঞ্চল।

কোন জোনের আকার কত
চাঁদপুরের মতলব উপজেলায় প্রায় ৪ হাজার একর জমিতে চাঁদপুর অর্থনৈতিক অঞ্চলটি হবে সরকারি উদ্যোগে। এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৩ হাজার ৯০ একর সরকারি খাস জমি এবং ৯১০ একর চর ভরাটের চিন্তা করছে বেজা।

ময়মনসিংহের ত্রিশালে হবে হামিদ ইকোনমিক জোন। এর আয়তন হবে ১৫৩ একর। ময়মনসিংহের ভালুকায় নিশিন্দাবাজার মৌজায় ১০০ একর জমিতে আনন্দ স্পেশাল ইকোনমিক জোনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

ডেটা সফট আইটি পার্ক নামের একটি তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রস্তাব করা হয়েছে ঢাকার উত্তরায়। যার আয়তন হবে সাড়ে ১২ বিঘা।

কাজী ফার্মস চট্টগ্রামের চন্দনাইশে কাজী ফার্মস ইকোনমিক জোন নামে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল করছে। এর আয়তন ১৩০ দশমিক ৬৩ একর।

পোশাক খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় ১৪০ একর জমিতে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল করবে। সাদ মুছা গ্রুপ চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ৯০ একর জমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল করবে।

স্ট্যান্ডার্ড গ্লোবাল ইকোনমিক জোন করা হচ্ছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাছে। সেখানে মাটি ভরাটের কাজ শেষ হয়েছে।

নতুন করে আরও অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ চলছে। স্থান নির্বাচনও চলমান। বেজা’র গভর্নিং বোর্ড এসবের সম্ভাব্যতা যাচাই করে অর্থনৈতিকভাবে যোগ্য মনে করলে উন্নয়নকাজ শুরু হবে।

উৎপাদন শুরু

নারায়ণগঞ্জে মেঘনার তীরে আমান অর্থনৈতিক অঞ্চলে সিমেন্ট, মুরগির খাদ্য, প্যাকেজিং পণ্য ও জাহাজ তৈরির কারখানা প্রতিষ্ঠা করেছে আমান গ্রুপ।

এ অঞ্চলের কর্মকর্তারা জানান, এখানে ১৬ হাজার কর্মী কাজ করছেন। পাশাপাশি চীন, জার্মানি, জাপান থেকেও বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। এখানকার আয়তন মোট ৮৪ একর।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে মেঘনা গ্রুপের মেঘনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোনমিক জোনে প্রায় ১০০ একর জমিতে একটি ইস্পাতের ভবন তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছে। এতে তৈরি করা হচ্ছে প্রি-ফেব্রিকেটেড বিল্ডিং ম্যাটেরিয়াল। এই জোনে আরও কয়েকটি কারখানার কাজ চলছে।

মেঘনার তীরে ২৪৫ একর জমিতে মেঘনা গ্রুপের মেঘনা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ শেষ।

গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে কাগজ, টিসু, ভোজ্যতেল পরিশোধনাগার, আটার মিল, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ কয়েকটি কারখানা গড়ে তুলেছে মেঘনা গ্রুপ।

বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, বঙ্গবন্ধু শিল্পশহর ও শ্রীহট্ট অর্থনৈতিক অঞ্চলের কারখানাগুলো আগামী বছরের শেষ দিকে উৎপাদনে যাবে আশা করা যায়। বেসরকারি ছয়টি অর্থনৈতিক অঞ্চলে ইতোমধ্যে উৎপাদন শুরু হয়েছে।

অর্থনৈতিক অঞ্চল নীতি

উল্লেখ্য, ২০১০ সালের আগস্টে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল আইন পাস হয়। ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম পরিচালনা পরিষদের বৈঠক।

অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির কাজ শেষ করতে ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প (পর্যায়-১)’ শীর্ষক একটি প্রকল্পও হাতে নেয় সরকার। বেজার পরিচালনা পরিষদের চেয়ারম্যান এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ইতোমধ্যেই বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল নীতি ২০১৪ প্রণয়ন হয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চল আইন ২০১০ এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল বিধিমালা ২০১৪ সংশোধন করা হয়েছে।